June 22, 2024, 12:30 pm

দিন বদলের গল্প -পদ্মা সেতু

দিন বদলের গল্প: পদ্মা সেতু

Spread the love

লেখক: মো. হাসিব উদ্দীন চঞ্চল, সম্পাদক বিডি সোশ্যাল নিউজ

পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে স্থাপনে দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে বাংলাদেশ। দেশের মর্যাদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশ কিছু করতে পারে এবং বাংলাদেশ এখন একটি সক্ষম দেশ- এটা প্রমাণিত হয়েছে বিশ্বদরবারে।

দক্ষিণবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ছিল প্রমত্ত পদ্মার বুকে একটি কাঙ্ক্ষিত সেতু। যা বর্তমান সরকারের বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষনতা ও সাহসী পদক্ষেপের কারনে ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে কোটি কোটি মানুষের সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবে দৃশ্যমান। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য তিনি সম্ভাব্য সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যাচ্ছেন; সুনিপুণ দক্ষতার সঙ্গে একের পর এক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন।

পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দেশে ব্যাপক অর্থনৈতিক সুপ্রভাব পড়বে। এ বিষয়ে সেতুর ডিজাইন পরামর্শক মনসেল ২০১০ সালে এক বিশ্লেষণ বা স্টাডি রিপোর্ট সেতুর বোনফিট কস্ট রেশিও (বিসিআর) ১ দশমিক ৭ এবং ইকোনমিক ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন (ইআরআর) ১৮ শতাংশ উল্লেখ করেছেন। সেতু নির্মাণ ব্যয় যুক্ত হয়ে বিসিআর ২ দশমিক ১ এবং ইআরআর দাঁড়াবে ২২ শতাংশ। অর্থাৎ এ সেতু নির্মাণ অর্থনৈতিক বিবেচনায় লাভজনক হবে।

দক্ষিণবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ছিল প্রমত্ত পদ্মার বুকে একটি কাঙ্ক্ষিত সেতু। যা বর্তমান সরকারের বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষনতা ও সাহসী পদক্ষেপের কারনে ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে কোটি কোটি মানুষের সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবে দৃশ্যমান।

দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ দূরত্ব ২ থেকে ৪ ঘণ্টা কমে আসবে। রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ পথ হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, কাঁচামাল সরবরাহ সহজলভ্য হবে এবং শিল্পায়নের প্রসার ঘটবে, অর্থাৎ ছোট বড় নানা শিল্প কারখানা ২১টি জেলায় গড়ে উঠবে। কৃষির ব্যাপক উন্নতি ঘটবে। কৃষক পণ্যের একটি ভাল মূল্য পাবে। উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ডিজাইন পরামর্শক ছাড়াও বিশ্বব্যাংকের স্বাধীন পরামর্শক এবং সেতু বিভাগ নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও সেতু নির্মাণের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করেছে। এসব সমীক্ষা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, সেতু নির্মাণের অর্থনৈতিক প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের বার্ষিক জিডিপি ২ শতাংশ এবং দেশের সার্বিক জিডিপি ১ শতাংশের অধিক হারে বাড়বে।

পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দেশের সমন্বিত যোগাযোগ কাঠামোর উন্নতি হবে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ট্রান্স-এশিয়ান হাইওয়ে (এন-৮) ও ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগ স্থাপিত হবে। সেতুর উভয় পাড়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক ও প্রাইভেট শিল্পনগরী গড়ে উঠবে। বিনিয়োগ বাড়বে এবং বাড়বে কর্মসংস্থান। মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর সচল হবে। পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটবে এবং দক্ষিণ বাংলার কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবন, ষাট গম্বুজ মসজিদ, টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধু মাজার, মাওয়া ও জাজিরা পাড়ের রিসোর্টসহ, নতুন পুরানো পর্যটন কেন্দ্র দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা হবে।

যমুনা বঙ্গবন্ধু সেতুর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে যানবাহন বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোগ-চাহিদা বৃদ্ধির যে প্রাক্কলন করা হয়েছিল, বাস্তবে প্রসার ঘটেছে এর চেয়ে আরও বেশি। সেই হিসেব করলে পদ্মা সেতু শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক প্রসার লাভ করবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

পদ্মাসেতুর ব্যয় নির্বাহের জন্য সেতু বিভাগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ২৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকার এক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ১ শতাংশ হারে ৩৫ বছরের মধ্যে ১৪০ কিস্তিতে এই ঋণের অর্থ সেতু বিভাগ পরিশোধ করবে। কাজেই টোল এমনভাবে আদায় করতে হবে, যাতে ঋণের অর্থ ও সেতু রক্ষণাবেক্ষণের যাবতীয় খরচ টোল থেকে করা যায়। বর্তমানে ফেরি পারাপার খরচের চেয়ে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করলে ঋণের টাকা সহজে শোধ করা যাবে। কিন্তু এইটি করা ঠিক হবে না। তাতে জীবন যাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। যে কারণে পদ্মাসেতু করা, তার উপকার আমরা পাবো না। পণ্যের আনা-নেয়ার ব্যয় বেড়ে যাবে। সাধারণ মানুষ উপকার পাবে না। তাই ঋণের চুক্তির মেয়াদ কমপক্ষে ৫০ বছর করে সুদের হার কমিয়ে আনতে হবে। তার ফলে টোলের আদায়কৃত অর্থ কম হবে। যানবাহনের ব্যয় কম হবে। পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল থাকবে। কৃষক ও ব্যবসায়ী সকলে উপকৃত হবে।

এডিবির সমীক্ষা বলছে, পদ্মা সেতু দিয়ে ২০২২ সালে যে ২৪ হাজার যানবাহন চলবে, তার মধ্যে বাস চলবে আট হাজার ২৩৮টি, ট্রাক ১০ হাজার ২৪৪টি, মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলবে পাঁচ হাজারের বেশি। সমীক্ষায় আরও প্রাক্কলন করা হয়েছে, ২০২৫ সালে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে দিনে যানবাহন চলাচল বেড়ে দাঁড়াবে ২৭ হাজার ৮০০টি। ২০৩০ সালে হবে ৩৬ হাজার ৭৮৫। ২০৪০ সালে দিনে যানবাহন চলাচল বেড়ে দাঁড়াবে ৫১ হাজার ৮০৭টি। পাশাপাশি জাইকার সমীক্ষামতে, পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দেশের এক দশমিক দুই শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধি পেয়ে আঞ্চলিক জিডিপি বৃদ্ধি দাঁড়াবে তিন দশমিক পাঁচ শতাংশে।

বিগত কয়েক বছর ধরে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বিভিন্ন সামাজিক সূচকের ক্রম উন্নতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। পদ্মাসেতুর মতো মেগা প্রকল্প নিজস্ব অর্থে করার কারণে বাংলাদেশের সক্ষমতার স্বীকৃতি মিলেছে। যদিও পদ্মা সেতু বাংলাদেশের একমাত্র মেগা প্রকল্প নয়, এর আগেও এদেশে বহু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে পদ্মা সেতুর বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই সেতু নির্মাণে বাংলাদেশ কারও কাছে হাত পাতে নাই। এটি বাংলাদেশের জন্য গৌরবের। কিন্তু ৭০ দশকেও শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে বাস করত, বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল দেশ হিসেবে আমাদের অবস্থা ছিল তলাবিহীন ঝুড়ির মতো, সেই দেশ এখন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু এবং এর সংযোগ সড়ক নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করেছে, এই গৌরববোধ ও আভি জাত্যের অনন্য অহংকার।


Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category